নানা অনিয়মের অভিযোগ: তারপরও কেন নির্বাচনে বিএনপি

229

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপির মাত্র কয়েকজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনগুলোতে অংশ নিয়ে জয় পেয়েছে শুধু বগুড়া-৬ আসনে। গত ২ বছরে অনুষ্ঠিত বেশিরভাগ নির্বাচন ভোটের মাঝপথে বর্জন করে দলটি। অভিযোগ, নির্বাচনে নানা অনিয়ম। এরপরও বিএনপি কেন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে- এমন প্রশ্ন নানা মহলের। শুধু তাই নয়, দলটির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতারও এ প্রশ্ন। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তৃণমূলকে উজ্জীবিত রাখার ‘কৌশল’ হিসাবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এসব নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে তারা দেশি-বিদেশিদের কাছে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করতে পেরেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি বরাবরই নির্বাচনের দিন এজেন্ট বের করে দেয়া, ভোট কারচুপি, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও মামলা- এসব অভিযোগ করে আসছে। তারপরও নির্বাচনে অংশ নেয়া দলটির স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত। এতে নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হওয়ার পরিবর্তে দল সম্পর্কে তৃণমূলে খারাপ বার্তা যাচ্ছে।

নির্বাচনের অংশ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি। আমাদের দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ কখনও ভিন্নপথে অর্থাৎ বন্দুক-পিস্তল, জোর করে অথবা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলে বিশ্বাসী নয়। বিএনপি জনগণের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। সেজন্য তারা সংগ্রাম করছেন, লড়াই করছেন।

তিনি বলেন- অনেকে বলেন, এ নির্বাচন করার কী যুক্তি আছে? আমরা বলি এ নির্বাচন করাটা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অংশ হিসাবে নিয়েছি। নির্বাচনে আমাদের নেতাকর্মী-সমর্থকদের সম্পৃক্ত করতে পারি এবং জনগণের কাছে যেতে পারি। যেটা অন্য সময় যাওয়াটা কঠিন ব্যাপার। যেতেই দেয় না, মুভ করতে দেয় না। সভা-সমিতি-মিটিং করতে দেয় না। যেটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ন্যূনতম অধিকার মানুষের জন্য। সেই ডেমোক্রেটিক স্পেসটা আমরা ব্যবহার করতে চাই। সে কারণে আমরা নির্বাচনে অংশ নেই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুগান্তরকে বলেন, ভোটে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও মিছিল-মিটিং করা যায়। মামলা-হামলাও হয়। কিন্তু অন্য সময় প্রোগ্রাম করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। সেজন্য নির্বাচনে অংশ নিয়ে স্পেসটা ব্যবহার করা হচ্ছে। নেতাকর্মীরা মিছিল-মিটিং করার সুযোগ পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর সংখ্যা অনেক, সুতরাং তাদের বিমুখ করা উচিত নয়। যদি আমরা নির্বাচন না করি তাহলে আমাদের কর্মীরা তো কোথাও না কোথাও জড়িয়ে পড়বে। এছাড়া ভোট যে ঠিকভাবে হচ্ছে না তা দেশি-বিদেশি সবাই দেখছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি ঘোষণা দিয়েছিল বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না। পরে দলটি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। গত ২ বছরে সংসদের দুটি ছাড়া সব উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন কিংবা স্থানীয় সরকারের ভোটে কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবকটিতেই দলীয় প্রার্থীরা পরাজিত হচ্ছেন। অধিকাংশেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হচ্ছে। এছাড়া মামলা-হামলার শিকার হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ভোটের মাঝপথে বর্জন কিংবা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, হয়তো কোনো পরিকল্পনার অংশ হিসাবে বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে কোনো সুফল আশা করে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এটা করা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। এটা একটা দূরবর্তী সিদ্ধান্তের কারণে বা একটা লক্ষ্যে পৌঁছানোর কৌশল হয়তো।

সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন কিংবা পৌর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। তারপরও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে দলটি। আবার ভোটের দিন দলীয় পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগের পর আবার অংশগ্রহণ স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত। হয়তো বিএনপি মনে করছে, নির্বাচনে না গেলে দেশে-বিদেশে বদনাম হবে যে- তারা (বিএনপি) নির্বাচনে যেতে চায় না। এসব বিবেচনা করেই হয়তো দলটি ভোটে অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখারও কৌশল হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, বিএনপি এখন দোদুল্যমানতায় ভুগছে। বিএনপি নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ করছে। আবার নির্বাচনে অংশও নিচ্ছে। বিএনপি মনে করছে, নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির বদনাম হবে যে, তারা নির্বাচনে যেতে চায় না। তাই নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি জেনেও বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশবাসীকে বিএনপি জানাতে চাচ্ছে যে, তারা নির্বাচনমুখী দল এবং এর মধ্য দিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন- আমার ধারণা, বিএনপি মনে করে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে হলে নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ভোটে অংশ নেওয়া হচ্ছে একটা প্রক্রিয়া, যার মধ্যে দিয়ে শক্তি টিকিয়ে রাখা যায়। কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা যায়। সেটাই করছে বিএনপি। নির্বাচনে যদি অংশ না নেয় তাহলে দল ভেঙে যাবে, নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাতে করে দলটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

অবশ্য অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া উচিত নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়াটা দলটির দেউলিয়াপনার প্রতিফলন। নির্বাচনে যাওয়ার একটা কারণ হতে পারে প্রার্থীদের নমিনেশন দিলে তাদের কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায়।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে অনিয়ম দেখছে বিএনপি। অথচ প্রতিরোধ বা আন্দোলন করতে পারছে না। শতাধিক মেয়র নির্বাচন হলো, যদি তা থেকে ১০০ জন করেও লোক আনে, তাও তো ১০ হাজার লোকের জমায়েত হয়। কিন্তু তারা তা পারছে না।

তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ নিলে জোরেশোরে নামতে হবে। সরকার অন্যায় করছে এটা সত্য। তাই বলে একটা নির্বাচনেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারছে না- এটা কোনো কথা হলো! বিএনপির এখন দাবি করা উচিত নির্বাচন কমিশন না বদলালে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় কি তা নির্ধারণ করতে দলটির সিনিয়র নেতারা তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে জনগণের পরামর্শ নিতে পারেন।